শেয়ার বাজার

বাংলাদেশ ব্যাংক ও ইপিবি'র বার্ষিক রফতানি আয়ের হিসাবে পার্থক্য ১২ বিলিয়ন ডলার

বাংলাদেশ ব্যাংক ও ইপিবি'র বার্ষিক রফতানি আয়ের হিসাবে পার্থক্য ১২ বিলিয়ন ডলার
অর্থনীতি

সিসিএন ডেস্ক : বাংলাদেশ ব্যাংক ও রফতানি উন্নয়ন ব্যুরোর (ইপিবি) বার্ষিক রফতানি আয়ের হিসাবের মধ্যে পার্থক্য নতুন কিছু নয়। প্রতিবছর এই দুই প্রতিষ্ঠানের রফতানি আয়ের হিসাবে ২-৪ বিলিয়ন ডলার ফারাক থাকলেও এবার এই ব্যবধানের পরিমাণ ১২ বিলিয়ন ডলার, যা বিগত ৮ বছরের মধ্যে সর্বোচ্চ। সম্প্রতি ইপিবির দেয়া তথ্যানুযায়ী, ২০২২-২৩ অর্থবছরে পণ্য ও সেবা রফতানি আয়ের পরিমাণ ৬৩ দশমিক ০৫ বিলিয়ন ডলার। অন্যদিকে বাংলাদেশ ব্যাংকের হিসাব অনুযায়ী, এ রফতানি আয়ের পরিমাণ ৫০ দশমিক ৯৭ বিলিয়ন ডলার। এতে দুই প্রতিষ্ঠানের হিসাবের মধ্যে ফারাক দাঁড়িয়েছে ১২ দশমিক ০৮ বিলিয়ন ডলার। পূর্ববর্তী অর্থবছরের পরিসংখ্যান থেকে দেখা যায়, ২০২০-২১ অর্থবছরে দুই প্রতিষ্ঠানের হিসাবের ব্যবধান ছিল ৪ দশমিক ৭৩ বিলিয়ন ডলার, ২০২১-২২ অর্থবছরে তা বেড়ে ৮ দশমিক ৫১ বিলিয়ন ডলার হয়। ২০২২-২৩ অর্থবছরের মতো ২০২৩-২৪ অর্থবছরেও দুই প্রতিষ্ঠানের হিসাবের ব্যবধান দিনকে দিন বাড়ছে। এ প্রসঙ্গে প্রধানমন্ত্রীর সাবেক অর্থনীতি বিষয়ক উপদেষ্টা মশিউর রহমান বলেন, বাংলাদেশ ও ইপিবির হিসাবের মধ্যে ফারাক নতুন কিছু নয়। কিন্তু ১২ বিলিয়ন ডলারের ফারাক অনেক বেশি। এ ব্যাপারে সুষ্ঠু তদন্ত হওয়া প্রয়োজন। ইপিবি মূলত শুল্ক বিভাগ থেকে তথ্য সংগ্রহ করে। সে হিসাবে ইপিবির প্রদত্ত তথ্যের তুলনায় বাংলাদেশ ব্যাংকের তথ্য বেশি গ্রহণযোগ্য।

গতকাল বাংলাদেশ ইনস্টিটিউট অব ইন্টারন্যাশনাল অ্যান্ড স্ট্র্যাটেজিক স্টাডিজ (বিআইএসআইএস) অডিটোরিয়ামে আয়োজিত এক সেমিনারে প্রধানমন্ত্রীর সাবেক অর্থনীতি বিষয়ক উপদেষ্টা মশিউর রহমান এসব কথা বলেন।

মশিউর রহমান বলেন, একটি দেশের নীতিনির্ধারণের জন্য সঠিক তথ্য-উপাত্ত উপস্থাপনের কোনো বিকল্প নেই। এই তথ্য-উপাত্তের ওপর ভিত্তি করে সরকার পলিসি গঠন করে, প্রাইভেট খাত পরিকল্পনা সাজায়।

মশিউর রহমান বলেন, বিদেশে কর্মী পাঠানোর মধ্যে কোনো সার্থকতা নেই, যদি-না দেশে ভালো কর্মপরিবেশ তৈরি করা যায়। দেশের কর্মপরিবেশ এবং বেতন কাঠামো ঠিক করার মধ্য দিয়ে দেশের অর্থনীতিকে শক্তিশালী করা সম্ভব। অবশ্যই দেশের বাইরে আমরা শ্রম রফতানি করব, তবে এমন যাতে না হয় যে দেশে কর্মপরিবেশ বা ভালো বেতন কাঠামো নেই বলে শ্রমিকরা দেশ ছেড়ে যাচ্ছেন।

দেশের পোশাক খাতকে আরও উন্নত করতে চাইলে শুধু শ্রমশক্তির ওপর নির্ভর করলে হবে না মন্তব্য করে তিনি বলেন, শ্রমশক্তির পাশাপাশি দেশের গার্মেন্টস খাতে প্রযুক্তি ও মেশিনারি ব্যবহার বাড়াতে হবে। এ বিষয়ে বিনিয়োগ বাড়লে দেশের গার্মেন্টস খাতের উৎপাদন ঘুরে দাঁড়াবে।

প্রধানমন্ত্রীর সাবেক এ উপদেষ্টা বলেন, অন্য দেশের সঙ্গে তুলনা বা প্রতিযোগিতায় যাওয়ার আগে নিজেদের যোগ্য করে তুলতে হবে। দেশের অবকাঠামো যেমন সরকার দেখছে তেমন লজিস্টিক সাপোর্টের বিষয়টি প্রাইভেট খাতকে দেখতে হবে।

সেন্টার ফর পলিসি ডায়ালগের (সিপিডি) সম্মাননীয় ফেলো অর্থনীতিবিদ প্রফেসর ড. মোস্তাফিজুর রহমান বলেন, রফতানি উন্নয়ন ব্যুরো (ইপিবি) এবং বাংলাদেশ ব্যাংকের রফতানি আয়ের হিসাবের মধ্যে বিশাল ফারাক রয়েছে। গত অর্থবছরে ইপিবি’র হিসাব অনুযায়ী, বাংলাদেশের রফতানি আয় ছিল ৫৫ বিলিয়ন ডলার, আর বাংলাদেশ ব্যাংকের হিসাব অনুযায়ী ৪৩ বিলিয়ন ডলার। এই বিশাল ফারাকের ব্যাখ্যা আমরা জানতে চাই। কেন এমন হচ্ছে, এই ১২ বিলিয়ন টাকার হিসাব কোথায়, সেটি খুঁজে বের করতে হবে। তিনি বলেন, দেশের ডেটা এবং ইনফরমেশনের ব্যাপারে সজাগ থাকতে হবে। ইপিবি এবং বাংলাদেশের রফতানি আয়ের হিসাবে এত ফারাক কেন তা নিয়ে সুষ্ঠু তদন্তের প্রয়োজন।

তিনি বলেন, ইপিবি মূলত শুল্ক বিভাগ থেকে তথ্য সংগ্রহ করে থাকে। ইপিবি’র তথ্যের থেকে বাংলাদেশ ব্যাংকের তথ্য বেশি নির্ভরযোগ্য বলে মনে করি আমি। তবে এ ধরনের তথ্য সংগ্রহের ব্যাপারে সতর্ক থাকতে হবে। এসব তথ্যের ওপর ভিত্তি করে সরকার সিদ্ধান্ত নেয়। প্রাইভেট খাতও এসব তথ্যের ভিত্তিতে পরিকল্পনা প্রণয়ন করেন। দুই হিসাবে ফারাক থাকতে পারে কিন্তু এত ফারাক কেন সেটি বড় একটি প্রশ্ন। একই সঙ্গে দেশের অর্থনীতির বেহাল দশার জন্য সবসময় বৈশ্বিক অস্থিরতাকে দায়ী না করে নিজেদের ভেতরকার সমস্যা সমাধানের দিকে জোর দেয়ারও আহ্বান জানান ড. মোস্তাফিজুর রহমান।

অনুষ্ঠানে পররাষ্ট্রসচিব মাসুদ বিন মোমেন বলেছেন, আগামী ৫ বছরের মধ্যে দেশের টেক্সটাইল ও গার্মেন্টস খাতে ২৫ বিলিয়ন ডলার বিনিয়োগ করা হবে, যা ১০০ বিলিয়ন ডলার লক্ষ্যমাত্রা অর্জনে সহায়ক হবে। তিনি বলেন, শুধু ৮৫ শতাংশ রফতানি না, ৪০ লাখ মানুষের জীবন পোশাক খাতের সঙ্গে জড়িয়ে আছে। সম্প্রতি রফতানি কমে যাওয়ার বড় একটি কারণ হিসেবে পশ্চিমা দেশগুলোর উচ্চ মূল্যস্ফীতির কথা উল্লেখ করেন পররাষ্ট্রসচিব মাসুদ বিন মোমেন। বাংলাদেশের গ্রিন গার্মেন্টস কারখানা বিশ্বের জন্য একটি উদাহরণ এবং বাংলাদেশের জন্য একটি মাইলফলক বলে উল্লেখ করেন পররাষ্ট্রসচিব। তিনি বলেন, আমাদের উদ্দেশ্য শুধু আন্তর্জাতিক মান বজায় রেখে কারখানা তৈরি না, বরং এ খাতে সক্ষমতা প্রমাণ করে বেঞ্চমার্ক তৈরি করা।

মাসুদ বিন মোমেন বলেন, ইতোমধ্যে আমেরিকার প্রেসিডেন্ট মেমোরেন্ডামে দেশের পোশাকখাত নিয়ে প্রশংসা করা হয়েছে। অনেক নেতিবাচকতার মধ্যেও এটি আমাদের জন্য একটি ইতিবাচক বার্তা। এসডিজি-৫ অর্জন এবং এলডিসি গ্রাজুয়েশনকে ফলপ্রসূ করতে পোশাকখাতে শ্রমিকদের বিশেষ করে, নারী শ্রমিকদের সর্বোচ্চ গুরুত্ব দেয়ার কোনো বিকল্প নেই বলেও উল্লেখ করেন মাসুদ বিন মোমেন।

তিনি বলেন, আমাদের সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ হচ্ছে, শুধু একটি খাতের ওপর সর্বোচ্চ নির্ভরশীলতা। এটি আমাদের অর্থনীতিকে ভঙ্গুর করে তুলতে পারে। আমাদের অর্থনৈতিক খাতকে বহুমুখী করার কোনো বিকল্প নেই।

বাংলাদেশ পোশাক প্রস্তুতকারক ও রপ্তানিকারক সমিতির (বিজিএমইএ) সভাপতি ফারুক হাসান বৈশ্বিক বাজারে বাংলাদেশের পোশাক শিল্পের প্রতিযোগী সক্ষমতা ধরে রাখতে উদ্ভাবন, প্রযুক্তিগত মানোন্নয়ন, নকশা ও দক্ষতা উন্নয়নের অপরিহার্যতার উপর জোর দিয়েছেন। তিনি শিল্পের জন্য প্রধান অগ্রাধিকার হিসাবে পণ্য, ফাইবার এবং বাজার বৈচিত্র্যকরণের মূল ভূমিকার উপর জোর দেন।

ফারুক হাসান বলেন, বিজিএমইএ’র কৌশলগত রূপকল্প তুলে ধরে বলেন এই রূপকল্পের অন্যতম লক্ষ্য হলো শিল্পকে শ্রমনিবিড় শিল্প থেকে উদ্ভাবন, উচ্চ-মূল্যের উৎপাদন এবং আধুনিক উৎপাদন প্রক্রিয়ার দৃষ্টান্তে রূপান্তরকরণ। তিনি বলেন, আমরা শিল্পকে দীর্ঘ মেয়াদে প্রতিযোগীতামূলক রাখার জন্য, শ্রম-নিবিড় উৎপাদন থেকে উদ্ভাবন, উচ্চ-মূল্য এবং আধুনিক উৎপাদন প্রক্রিয়ায় রূপান্তরের মাধ্যমে শিল্পের পুনর্গঠনের জন্য রূপকল্প ঘোষনা করে কাজ করে যাচ্ছি।

নিট পোশাকশিল্প মালিকদের শীর্ষ সংগঠন বিকেএমইএর সহ-সভাপতি আখতার হোসাইন অপূর্ব বলেছেন, দেশের পোশাকখাতে উৎপাদন খরচ যে হারে বেড়েছে, সেই হারে চাহিদা বাড়েনি, বরং কমে গেছে। দেশের পোশাকখাতের বর্তমান অবস্থা নিয়ে বিকেএমইএর সহ-সভাপতি বলেন, সবাই পোশাক শ্রমিকদের বেতন বাড়ানোর কথা বলছেন। কিন্তু বৈশ্বিক পরিস্থিতির দিকে তাকালে বোঝা যাবে, যে হারে দেশের পোশাকখাতে উৎপাদন খরচ বেড়েছে, সেই হারে চাহিদা বাড়েনি, বরং কমে গেছে। দেশের পোশাকখাত নিয়ে তিনি বলেন, যুক্তরাষ্ট্রের ফেডারেল রিজার্ভের সুদহার বৃদ্ধির প্রভাব বিশ্বের প্রতিটি খাতে পড়েছে, বাংলাদেশ তার ব্যতিক্রম নয়। বৈশ্বিক অস্থিরতার কারণে দেশের পোশাকখাত বড় রকমের চাপের মধ্যে আছে।

অপূর্ব আরও বলেন, করোনার সময় পোশাক মালিকরা বাজারে টিকে থাকতে বড় আকারে ঋণ নিয়েছেন। করোনা মহামরি শেষ হতে না হতেই রাশিয়া-ইউক্রেন যুদ্ধ শুরু হয়েছে। এতে গার্মেন্টস মালিকরা আরও চাপের মুখে পড়েছেন। শ্রমিকদের মজুরি নিয়ে তিনি বলেন, অনেকেই বলছেন শ্রমিকদের বেতন কম করে হলেও ১৫ হাজার টাকা হওয়া উচিত। বর্তমান ১২ হাজার ৫০০ টাকার সঙ্গে ওভারটাইম যোগ করলে বেতন ১৫ হাজার টাকা উঠে যায়। এদিকে আমাদের নজর দেয়া উচিত।

বিকেএমইএ সহ-সভাপতি বলেন, গার্মেন্টস দেশের সামাজিক অবস্থাকে বদলে দিয়েছে। আগে গ্রামে যেসব মেয়ে বাল্যবিবাহের শিকার হতো, পোশাকখাতের কল্যাণে তারা আজকে স্বাবলম্বী। দেশের অর্থনীতি শুধু বেতন দিয়ে না, সামগ্রিক এ পরিবর্তন দিয়ে বিচার করতে হবে। আখতার হোসাইন অপূর্ব বলেন, বৈশ্বিক পোশাকখাতে চীনের শেয়ার ৪০ শতাংশ। এতে বাংলাদেশের দখল রয়েছে ২০ দশমিক ২৫ শতাংশ। চীন কেন্দ্রিক পশ্চিমাদের অস্বস্তি অজানা নয়। এক্ষেত্রে বাংলাদেশ ছাড়া তাদের বড় কোনো বিকল্প নেই। একই সঙ্গে এটি বাংলাদেশের জন্য বড় একটি সুযোগও বটে।

সুত্র : সিপিডি